
চাকরির আশায় ২০ হাজার টাকা, ছাগল বিক্রি করে টাকা দিয়েও অনিশ্চয়তায় নাওফুলি…!
বিশেষ প্রতিনিধি:
ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে দপ্তরির চাকরি দেওয়ার আশ্বাসের অভিযোগ—‘আজ-কাল করে সময় পার করছেন’ বগুড়ার শাজাহানপুর থানাধীন বনানী বেজোড়া তালতলা বন্দর এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে দপ্তরির চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এক অসহায় নারীর কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সানজিদা ওরফে মঞ্জু (৩৭) নামের এক নারীর বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারী নাওফুলি বেগম জানান, তিনি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের একজন নারী। অন্যের জায়গায় টিনশেড ঘর তৈরি করে স্বামী ও চার সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন। সংসারের ব্যয় মেটাতে তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করেন। পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যেও একটি চাকরির আশায় নিজের পোষা ছাগল বিক্রি করে প্রায় এক মাস আগে সানজিদা ওরফে মঞ্জুকে ২০ হাজার টাকা দেন।
নাওফুলির ভাষ্য অনুযায়ী, টাকা নেওয়ার সময় সানজিদা তাকে আশ্বাস দেন, অল্প সময়ের মধ্যেই ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে দপ্তরির চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও চাকরি হয়নি এবং টাকা ফেরতও পাননি বলে অভিযোগ নাওফুলির।
নাওফুলি বলেন, ‘আজ চাকরি হবে, কাল চাকরি হবে—এভাবে আমাকে সময় পার করে দেওয়া হচ্ছে। আমি গরিব মানুষ। মানুষের বাড়িতে কাজ করে চার সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। চাকরির আশায় ছাগল বিক্রি করে টাকা দিয়েছিলাম।’
তিনি আরও জানান, চাকরি দেওয়ার বিষয়ে তাকে কোনো লিখিত কাগজপত্র বা নিয়োগসংক্রান্ত নথি দেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি অন্য কাউকে না বলার জন্য বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আরও কয়েকজনের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ
নাওফুলি বেগমের অভিযোগ, শুধু চাকরি দেওয়ার কথা বলেই নয়, বিভিন্ন ব্যক্তিকে ওই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও সানজিদা ওরফে মঞ্জু অর্থ নিয়েছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে অভিযোগ রয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট সামিউল ইসলামের পরিবারের একজন সদস্যের কাছ থেকেও স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হয়েছে। একইভাবে একই এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বী এক নারীর মেয়ে বৃষ্টির কাছ থেকেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগের কথা জানা গেছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘তিনি কি সত্যিই স্কুলের ম্যাডাম?’
অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সানজিদা ওরফে মঞ্জু নিজেকে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ম্যাডাম হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন কি না এবং তিনি আদৌ ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে সানজিদা ওরফে মঞ্জুর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাওফুলির দাবি, সানজিদার স্বামী মো. ফারুক হোসেনও তার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি জানেন।
‘টাকা ফেরত না দিলে স্কুল পর্যন্ত যাব’
নাওফুলি বেগম বলেন, তিনি আরও কিছুদিন অপেক্ষা করবেন। চাকরি দিতে না পারলে তিনি তার দেওয়া টাকা ফেরত চান।
তার ভাষায়, ‘আমি গরিব মানুষ। অনেক কষ্ট করে টাকা জোগাড় করেছি। সে যদি আমার টাকা ফেরত না দেয়, তাহলে প্রয়োজনে আমি সরাসরি স্কুলে গিয়ে বিষয়টি জানাব।’
চাকরির আশায় টাকা দিয়ে বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা নাওফুলির কণ্ঠে অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গণমাধ্যমকর্মীর সামনে নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
চোখের পানি মুছতে মুছতে তার প্রশ্ন—‘একটি চাকরির আশায় এত কষ্ট করে টাকা দিয়েছি। এখন চাকরিও হলো না, টাকাটাও ফেরত পাচ্ছি না। আমি গরিব মানুষ—আমি কি এর বিচার পাব?’
অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
একজন অসহায় নারী চাকরির আশায় অর্থ দিয়েছেন—এমন অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। আবার অভিযোগের বিপরীতে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অবস্থানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই অভিযোগটির নিরপেক্ষ তদন্ত, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ যাচাই এবং সানজিদা ওরফে মঞ্জু আদৌ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সঙ্গে যুক্ত কি না—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন নাওফুলির মতো অসহায় মানুষেরা।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply