
ময়মনসিংহ পাসপোর্ট অফিসে দুর্নীতির জাল ভাঙবে কবে? দালাল সিন্ডিকেটে জিম্মি সেবা, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ
ব্যুরো চীফ, ময়মনসিংহ।।
ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে দুর্নীতির এক সুসংগঠিত চক্র, যা এখন প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘুষ বাণিজ্য, দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, ইচ্ছাকৃত ফাইল জটিলতা তৈরি এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের পর স্বল্প সময়ের জন্য কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও, পুনরায় চালু হতেই আগের চিত্র ফিরে আসে। অভিযোগ রয়েছে, ‘চ্যানেল ফাইল’ নামে একটি অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিটি আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০টি আবেদন জমা পড়ায়, এই অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকায়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, নির্দিষ্ট দালালদের মাধ্যমে সংকেত বা কোড ব্যবহার করে ফাইল জমা দিলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে সাধারণভাবে আবেদন করলে নানা অজুহাতে ফাইল আটকে দেওয়া হয় কিংবা ‘ত্রুটি’ দেখিয়ে বারবার ফেরত দেওয়া হয়। এতে বাধ্য হয়ে অনেকেই দালালের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে থাকা কম্পিউটার দোকানগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট। এসব দোকান থেকেই আবেদনপত্র পূরণ, ফি জমা এবং ফাইল ‘ম্যানেজ’ করার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অফিসের কিছু কর্মচারী, পিয়ন ও আনসার সদস্যদের সঙ্গে এই সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি অফিস কক্ষেও দালালদের অবাধ যাতায়াত লক্ষ্য করা যায় বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
এছাড়া নির্ধারিত সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামেও টাকা নেওয়া, অনলাইন ফি জমা, ছবি তোলা ও কাগজপত্র প্রস্তুতের প্রতিটি ধাপে বাড়তি খরচ চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জরুরি পাসপোর্টের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সময়সীমা মানা হচ্ছে না—তবে দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন অনেকেই।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা সাধারণ মানুষ এই দুর্নীতির শিকার বেশি হচ্ছেন। নিয়ম-কানুন সম্পর্কে অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করে বলছে, দালালমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই অনিয়মের পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিতার অভাবেই এই দুর্নীতি বিস্তার লাভ করছে।
তারা আরও বলেন, এটি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়—বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাকে জিম্মি করে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করার শামিল। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, জড়িতদের শনাক্ত করে অপসারণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, ময়মনসিংহ পাসপোর্ট অফিসে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা হবে।
অন্যথায় এই দুর্নীতির চক্র আরও বিস্তৃত হয়ে জনসেবাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply